বুধবার, ১৭ Jun ২০২৬, ০৯:১২ অপরাহ্ন
হোসাইন মোহাম্মদ সাগর
বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের বড় অংশ দরিদ্র, স্বল্পশিক্ষিত এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে আসা—এই বাস্তবতা উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) পরিচালিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বিচারিক কাঠামোতে শ্রেণিগত বৈষম্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৩৯ জনের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এমনকি তাদের পরিবারগুলোও সামাজিকভাবে নানা হয়রানির শিকার হয়েছেন।
দীর্ঘসূত্রতা, অনিশ্চয়তা ও বাড়তি শাস্তি:
গবেষণার ফলাফল বলছে, ৪৬ শতাংশ মামলায় হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হতে সময় লেগেছে কমপক্ষে ১০ বছর। আর গড় সময় ছিল সাড়ে পাঁচ বছর। এই দীর্ঘ সময় ফাঁসির আসামিদের জন্য মানসিক নির্যাতনের সমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, “১৫–২০ বছর পর্যন্ত ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অপেক্ষা করতে হয়, এটি তার জন্য বাড়তি শাস্তি হয়ে যায়।”
আইনের জটিলতা ও প্রান্তিক মানুষের অসহায়তা:
এই দীর্ঘ সময়ের আইনি লড়াই সহজ নয়, বিশেষ করে দরিদ্র আসামিদের জন্য। উচ্চমানের আইনজীবী নিয়োগ, উচ্চ আদালতে আপিলের খরচ, বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতা—সব মিলিয়ে প্রান্তিক মানুষ একা পড়ে যায়।
গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপনকারী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, “অধিকাংশ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি থেকে এসেছেন। বিচার ব্যবস্থার কাঠামো, প্রক্রিয়া ও খরচ তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও অপ্রতিসম।”
অপরাধ কমছে না, ন্যায়বিচার হচ্ছে না?
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. নিজামুল হক বলেন, “লোকেরা মনে করে মৃত্যুদণ্ডে অবৈধ কাজ কমে। আমি তা মনে করি না। মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও অপরাধ হয়, না থাকলেও হয়।” তার মতে, মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং এটি সমাজে প্রতিশোধপরায়ণতা বাড়ায়।
নতুন করে ভাবার সময় এসেছে:
বিশ্বজুড়ে যখন মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্তির দিকে এগোচ্ছে রাষ্ট্রগুলো—১০৮টি দেশে ইতোমধ্যেই এটি নিষিদ্ধ—তখন বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং তার সামাজিক ও শ্রেণিগত প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, “শুধু বিচার নয়, আমাদের সমাজে শিক্ষার সুযোগ এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অভাবও অপরাধে জড়ানোর বড় কারণ। মৃত্যুদণ্ড দিয়ে সমস্যার মূলে প্রভাব ফেলা যায় না। তাই আইনের সংস্কারের পাশাপাশি সমতা ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার দিকেও মনোযোগ দিতে হবে।”
বিচারের নামেই বৈষম্য?
আইনজীবী সারা হোসেন প্রশ্ন তোলেন, “ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকায় কেন সবসময় গরিবরা থাকে? কেন ধনী ও প্রভাবশালীরা এমন সাজা এড়াতে পারেন? এই প্রশ্নগুলো আমাদের বিচার ব্যবস্থার নৈতিকতা এবং ভারসাম্য নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।”
শেষকথা:
মৃত্যুদণ্ড কি আদৌ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, নাকি এটি আমাদের বিচারব্যবস্থায় লুকিয়ে থাকা শ্রেণিগত বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তোলে—এই প্রশ্নটি এখন সময়ের দাবি। যখন ধনী অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়, আর গরিব মানুষ মৃত্যুর জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন “বিচার” শব্দটি নিজের অর্থ হারায়।
বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড শুধু অপরাধ দমনের একটি উপায় নয়, এটি হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে লুকিয়ে থাকা বৈষম্যের একটি নিঃশব্দ দলিল।
হোসাইন মোহাম্মদ সাগর
মৃত্যুদণ্ড বিলোপ বিষয়ক মানবাধিকার কর্মী ও লেখক।
ইমেইল: sendhusagar@gmail.com